
অধর্মের বিরুদ্ধে নীরবতাই সবচেয়ে বড় অধর্ম — দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ থেকে চিরন্তন শিক্ষা
ধর্মতত্ত্ব ডেক্স, HindusNews :
মহাভারত কেবল একটি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক যুদ্ধগাথা নয়; এটি মানবসভ্যতার নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও ধর্মবোধের এক অমর দলিল। সেই মহাকাব্যের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও শিক্ষণীয় অধ্যায় হলো কুরুসভায় দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। এই ঘটনা শুধু এক নারীর অপমানের কাহিনি নয়, বরং একটি সমাজ কীভাবে নৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে—তার জ্বলন্ত উদাহরণ।
পাণ্ডবদের জুয়া খেলায় সর্বস্ব হারানোর পর দুর্যোধনের নির্দেশে দুঃশাসন সভায় দ্রৌপদীকে টেনে আনে। কুরুসভায় তখন উপস্থিত ছিলেন ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, বিদুরের মতো মহাজ্ঞানী ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বরা। অথচ নারীর প্রকাশ্য অপমানের মুহূর্তে অধিকাংশই নীরব থাকেন। এই নীরবতা কোনো সাধারণ নীরবতা ছিল না—এটি ছিল ধর্মের ব্যর্থতা, ন্যায়ের পতন। মহাভারত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি থাকা সত্ত্বেও চুপ থাকা হয়, সেখানে অধর্ম অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা অনুযায়ী, ধর্ম মানে শুধু আচার-অনুষ্ঠান পালন নয়। ভগবদ্গীতার মূল বক্তব্য হলো—কর্তব্য থেকে পলায়নও পাপের শামিল। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় যারা সরাসরি অন্যায় করেনি, কিন্তু প্রতিবাদও করেনি, তারাও অধর্মের অংশীদার হয়ে পড়েছিল। এই নৈতিক ব্যর্থতাই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধকে অনিবার্য করে তোলে।
সনাতন ধর্মে ধর্মের অর্থ অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক। ধর্ম মানে ন্যায় রক্ষা করা, দুর্বলকে সুরক্ষা দেওয়া, নারীর সম্মান বজায় রাখা এবং পরিবার ও সমাজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। যেখানে নারী অপমানিত হয়, সেখানে ধর্ম টিকে থাকতে পারে না—দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ এই সত্যকেই চিরকালের জন্য প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মহাভারত আমাদের আরও শেখায়—জীবনের দৈর্ঘ্য নয়, জীবনের মর্যাদাই আসল। অন্যায়ের সামনে মাথা নত করে দীর্ঘ জীবন কাটানোর চেয়ে, ধর্মের পক্ষে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করাই শ্রেয়। শ্রীকৃষ্ণের আদর্শে ধর্মরক্ষাই সর্বোচ্চ কর্তব্য।
পরিবার, সমাজ বা ধর্মের উপর যখন অন্যায় হয়, তখন নিরপেক্ষ থাকার অর্থই হলো অধর্মকে শক্তিশালী করা। ইতিহাস সাক্ষী—দ্রৌপদীর সময়ে যারা নীরব ছিল, তারা কেউই ধর্মরক্ষকের মর্যাদা পায়নি। সনাতন ধর্ম বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শুধু অধিকার নয়, এটি এক অনিবার্য দায়িত্ব।
আজকের সমাজেও দ্রৌপদীর শিক্ষা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নারীর প্রতি সহিংসতা, অবমাননা ও সামাজিক অন্যায় আজও বিদ্যমান। মহাভারতের বার্তা আজও আমাদের বলে—অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলো, সত্যের পক্ষে দাঁড়াও, ধর্ম ও পরিবারের মর্যাদা রক্ষা করো। কারণ অধর্ম সবসময় অস্ত্র হাতে আসে না; অনেক সময় নীরবতার আড়ালেই সে সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
উপসংহারে বলা যায়, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ আমাদের শেখায়—ধর্ম রক্ষার জন্য কেবল জ্ঞান যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সাহস ও দৃঢ়তা। যে সমাজ অন্যায়ের সামনে নীরব থাকে, সে সমাজ নিজেই নিজের ধ্বংস ডেকে আনে। তাই সনাতন ধর্মের চিরন্তন আহ্বান—ধর্ম রক্ষা করো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াও, নীরব থেকো না।
অধর্মের বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোই সবচেয়ে বড় অধর্ম—এই অমোঘ সত্যই মহাভারতের চিরন্তন শিক্ষা।